মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এক নতুন স্বর্ণযুগে নিয়ে যাবেন। তার দাবি, শুল্ক আরোপ, আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও কড়াকড়ি অভিবাসন নীতি শেষ পর্যন্ত দেশটির অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। চাকরির বাজারে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হচ্ছে। এ পরিস্থিতি আগামী কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান দলকে বড় চাপের মুখে ফেলছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। খবর এফটি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিউরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিকস (বিএলএস) জানিয়েছে, গত মাসে দেশটিতে মাত্র ২২ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। আগের কয়েক মাসেও চাকরি বৃদ্ধির হার খুব দুর্বল ছিল। গত তিন মাসে গড়ে ২৯ হাজার চাকরি সৃষ্টি হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ অর্থনীতির জন্য কার্যত স্থবিরতার সমান। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের মন্থরতা বড় ধরনের সতর্ক সংকেত। ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চ শুল্কনীতি ও বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মী নিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ইনফ্লেশন ইনসাইটসের বিশ্লেষক ওমাইর শরীফ বলেন, ‘বাণিজ্যনীতি ও সামগ্রিক নীতিগত অনিশ্চয়তা নিয়োগে টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে এবং এটি দ্রুত কাটবে বলে মনে হয় না। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি প্রথমে রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখা হলেও এখন তা শিল্প খাতে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন, নির্মাণ, জ্বালানি ও খনন খাত এবং পাইকারি বাণিজ্যে চাকরি হারানো বেশি ঘটছে। কেবল আগস্টেই এসব খাতে মোট ৩৭ হাজার চাকরি হারিয়েছে।’
ডেমোক্র্যাট সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে এ স্থবিরতাকে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। নিউ হ্যাম্পশায়ারের সিনেটর ম্যাগি হাসান বলেন, ‘দেশে জীবনযাত্রার খরচ ক্রমেই বাড়ছে, উৎপাদন খাত সংকুচিত হচ্ছে, আর ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ বা নতুন কর্মী নিয়োগের ব্যাপারে দ্বিধায় ভুগছে। কারণ অর্থনীতি অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন। অন্যদিকে ওরেগনের সিনেটর রন ওয়াইডেন আরো কড়া ভাষায় সমালোচনা করে বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক দল দেশের অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিককে বরখাস্ত করা উচিত।’
এদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি বিএলএস কমিশনারকে বরখাস্ত করেছেন। পাশাপাশি তিনি ফেডারেল রিজার্ভকে চাপ দিচ্ছেন, যাতে তারা দ্রুত সুদহার কমায়। ট্রাম্পের যুক্তি উচ্চ সুদহার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউজের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কেভিন হ্যাসেট ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, আগস্টে চাকরির দুর্বল তথ্য সাময়িক একটি ঘটনা, যা পরে সংশোধিত হয়ে বাড়তে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো শক্তিশালী, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রিত ও মূলধন ব্যয়ে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।’
চাকরির বাজারে স্থবিরতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কারখানা–শ্রমিকনির্ভর খাতগুলোয়। অথচ ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় এ খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নির্মাণ, খনন ও উৎপাদন খাত শুল্কনীতির কারণে ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা নতুন প্রকল্প হাতে নিতে বা কর্মী বাড়াতে অনীহা প্রকাশ করছে। ফলে হাজার হাজার মানুষ চাকরি হারাচ্ছে এবং নতুন নিয়োগের সুযোগও কমে যাচ্ছে।
বিএলএসের সাবেক কমিশনার এরিকা গ্রোশেন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সংখ্যাগুলো হতাশাজনক। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল অর্থনীতির জন্য এ হার কার্যত কোনো কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার সমান। অর্থনীতির জন্য যা সতর্ক সংকেত।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সাফল্যকে নিজের বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক জনমত জরিপ ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। অর্থনীতি পরিচালনায় তার প্রতি আস্থার হার দ্রুত কমছে। রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকসের সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী, মাত্র ৪২ দশমিক ২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন ট্রাম্প ভালোভাবে অর্থনীতি পরিচালনা করছেন। বিপরীতে ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ নাগরিক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ ব্যবধান রিপাবলিকান দলের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ আগামী কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা এ ফলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ভোটারদের সামনে ট্রাম্পের নীতি ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন হঠাৎ কোনো বড় নীতি পরিবর্তন করবে না। বরং তারা আগের অবস্থানেই অটল থাকবে। মূলত ফেডারেল রিজার্ভকে চাপ দেয়া হবে, যাতে তারা দ্রুত সুদহার কমায়। একই সঙ্গে বিএলএসের মতো যেসব সংস্থা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে তাদের ওপরও রাজনৈতিক চাপ বজায় রাখবে হোয়াইট হাউজ। এভাবে প্রশাসন চেষ্টা করছে দুর্বল অর্থনৈতিক তথ্য আড়াল করে জনমনে ইতিবাচক বার্তা দেয়ার।
ওয়াশিংটনের পেন্টা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়লান মুই বলেন, ‘চাকরির বাজার মন্থর হওয়া ট্রাম্পকে আসলে তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটাই দিতে পারে। তা হলো সুদহার কমানো।’